ওয়াল স্ট্রিটের প্রধান সূচকগুলোর সাম্প্রতিক উল্লম্ফনে বড় ভূমিকা রাখছে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো, যাদের বিনিয়োগের বড় অংশজুড়ে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। প্রযুক্তি খাতনির্ভর ঊর্ধ্বমুখী এ প্রবণতা নিয়ে সতর্ক করে আসছিলেন বিশ্লেষকরা। এরই মধ্যে গত সপ্তাহে দেশটির প্রধান শেয়ার সূচকগুলোয় বড় আকারের ধস দেখা গেছে। ৭ নভেম্বর শেষ হওয়া সপ্তাহে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো প্রায় ১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ কোটি ডলার বাজারমূল্য হারিয়েছে। গত এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক ঘোষণার পর এটি মার্কিন পুঁজিবাজারের জন্য সবচেয়ে খারাপ সপ্তাহ। খবর এফটি।
উচ্চ মূলধন ব্যয়, বড় আকারের ঋণভিত্তিক বিনিয়োগ এবং বাজারে অতিমূল্যায়ন এখন মার্কিন অর্থনীতি ও ভোক্তা মনোভাবকে দুর্বল করে রেখেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রযুক্তি কোম্পানিনির্ভর শেয়ার সূচকগুলোয় পতন। চীনা প্রতিযোগীদের অল্প খরচের এআই মডেল এবং ওপেনএআইসহ বড় মার্কিন প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়েও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। ফলে এনভিডিয়া ও অন্যান্য প্রধান এআই কোম্পানির বাজার মূলধনে কয়েকশ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি করেছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, সপ্তাহের শেষে সম্মিলিতভাবে প্রায় ৮০০ বিলিয়ন বা ৮০ হাজার কোটি ডলার বাজারমূল্য হারিয়েছে এনভিডিয়া, মেটা, প্যালান্টির, ওরাকলসহ এআই-সংক্রান্ত বৃহৎ আটটি কোম্পানি। এতে এক সপ্তাহে ৩ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে প্রযুক্তিভিত্তিক নাসডাক কম্পোজিট সূচক।
লম্বার্ড ওডিয়ার ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজার্সের সামষ্টিক অর্থনীতি বিভাগের প্রধান ফ্লোরিয়ান ইলপো বলেন, ‘এআই-সংক্রান্ত মূলধন ব্যয় অনেক বড় এবং এর প্রায় পুরোটাই ঋণভিত্তিক। এ ধরনের পতন ২০০০ সালের টেক বাবলের সন্দেহজনক বিনিয়োগের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।’
চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, সম্মিলিতভাবে ১১ হাজার ২০০ কোটি ডলার মূলধন ব্যয় করেছে বৃহৎ চার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট, অ্যামাজন, মেটা ও গুগল। একই সময়ে এআই সম্প্রসারণে শত শত বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েছে খাতটি।
মার্কিন শেয়ারবাজারের সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বগতির পর থেকেই সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি গ্রুপগুলোর উচ্চ মূল্যায়ন নিয়ে উদ্বেগ বিরাজ করছিল। এর সঙ্গে চাপ হিসেবে যুক্ত হয়েছে দেশটির শ্রমবাজারের দুর্বলতা ও ভোক্তা আস্থার পতন। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোক্তা মনোবল সূচক চলতি মাসে তিন বছরের সর্বনিম্নে নেমেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, গত সপ্তাহের শেয়ারবাজার সূচকগুলোয় পতন সামগ্রিক এ চিত্রের প্রতিফলন।
৪০ দিনে পৌঁছা মার্কিন সরকারের দীর্ঘতম শাটডাউনের কারণে দেশটিতে প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক তথ্য প্রকাশ বন্ধ রয়েছে। তা সত্ত্বেও সেপ্টেম্বরের পর থেকে শ্রমবাজার যথেষ্ট দুর্বল, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এমন উদ্বেগ বাড়ছে। ভিসডম ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপের মাইক জিগমন্ট বলেন, ‘সম্ভবত ধীরে ধীরে মন্দার ঝুঁকি বাড়ছে।’
শিকাগো ফেডারেল রিজার্ভের হিসাব অনুযায়ী, অক্টোবর পর্যন্ত টানা ছয় মাস দেশটিতে নতুন নিয়োগের হার কমেছে। বড় কোম্পানিগুলোর ছাঁটাইয়ের ঘোষণায় বিনিয়োগকারীরা এখন আতঙ্কিত।
বিনিয়োগ সংস্থা ব্লু হোয়েল গ্রোথের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা স্টিফেন ইউ বলেন, ‘নিয়োগ অনেক দুর্বল। এর তুলনায় ফেডারেল রিজার্ভ পিছিয়ে আছে এবং দ্রুত সুদহার কমানো উচিত। আমরা শুধু এনভিডিয়ায় বড় বাজি ধরেছি। ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেনের অন্য কোম্পানিগুলো নিয়ে আমি খুবই উদ্বিগ্ন, তারা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে আর কত অর্থ খরচ করবে।’
গত সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এনভিডিয়া। প্রায় ৩৫ হাজার কোটি ডলার বাজার মূলধন কমেছে কোম্পানিটির। অথচ সপ্তাহ খানেক আগে প্রথম কোম্পানি হিসেবে ৫ ট্রিলিয়ন বাজারমূল্য ছুঁয়েছিল এনভিডিয়া। মাইক্রোসফট, ওরাকল ও ব্রডকম গত সপ্তাহে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর ভূরাজনৈতিক চাপ বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। সম্প্রতি চীনে প্রযুক্তি বিক্রি নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিবাচক ইঙ্গিত দিলেও এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াংয়ের মন্তব্য এর বিপরীত তথ্য দিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘এআই খাতে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় কয়েক ন্যানোসেকেন্ড পিছিয়ে আছে চীন।’ এর অর্থ ধরা হচ্ছে, এনভিডিয়ার নতুন ব্ল্যাকওয়েল এআই প্রসেসরের সংস্করণ চীনা গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করা সম্ভব নাও হতে পারে। এটি চিপ নির্মাতাদের জন্য বড় একটি ধাক্কা।
সম্প্রতি ৫০ লাখ ডলারের কম খরচে প্রশিক্ষিত কিমি কে২ মডেল উন্মোচন করেছে বেইজিং-ভিত্তিক মুনশট এআই। এতে প্রযুক্তি বাজারে মার্কিন ডেভেলপারদের অগ্রগণ্য সুবিধা কমতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ডিপসিক কম খরচের আর১ মডেল উন্মোচন করলে গত জানুয়ারিতে ওয়াল স্ট্রিটে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তখন একদিনে ৫৮ হাজার ৯০০ কোটি ডলার বাজারমূল্য হারিয়েছিল এনভিডিয়া।
৫০ হাজার কোটি ডলারের এআই স্টার্টআপ ওপেনআই মার্কিন সরকারের কাছে অর্থ সহায়তা চাইতে পারে বলে সাম্প্রতিক মন্তব্য করেছেন সংস্থাটির এক কর্মকর্তা। যার প্রভাব পড়েছে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর পর বাজার আস্থায়। কারণ এনভিডিয়া, এএমডি, ব্রডকম, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন ও গুগলের সঙ্গে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলারের বিভিন্ন ধরনের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে যুক্ত ওপেনএআই। অবশ্য সরকারি সাহায্য চাইবেন না বলে পরে মন্তব্য করেন ওপেনআইয়ের সিইও স্যাম অল্টম্যান।